বুধবার, ১১ জানুয়ারী, ২০১২

রোমেলা, সুইটি আর পুলিশ


bidisha-f11 
সেদিন এক বন্ধু ফোন করে বললেন, রোমেলার নিউজটা পড়েছেন?
আমি পড়ি নি। রোমেলা যে কে সেটাই জানি না। সে কি বিখ্যাত কেউ? তাকে কি আমার চেনা উচিত ছিলো? যদি বলি- পড়ি নি, তাহলে কি খুব বোকার মতো উত্তর দেয়া হয়ে যাবে?

এমনিতে সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা পড়া, আরও অনেকের মতো আমারও অনেক পুরানো একটা অভ্যাস। আগে প্রতিদিনই কিছু না কিছু সুখবর পাওয়ার আশা নিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানো শুরু করতাম। বেশির ভাগ দিনই সে আশা মিটতো না, বরং উল্টো হতাশাই যেন ভর করতো মনে। রাজনৈতিক নেতাদের গৎবাধা বুলি, প্রতিশ্রুতি, প্রতিবাদ, হুঙ্কার, পাল্টা হুঙ্কার- এসবই যেন প্রতিদিনের বিষয়বস্তু পত্রিকার। ফলে ইদানিং পত্রিকা আর তেমন পড়া হয় না, চোখ বুলানোই সাড়া। দেখা যায়, চা’য়ের কাপ খালি হওয়ার আগেই পত্রিকার সবক’টি পৃষ্ঠা উল্টানো হয়ে গেছে।
সেদিনও তাই হয়েছে। পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলানো হয়েছে, পড়া হয়নি তেমন কিছুই। কিন্তু রোমেলা কোথায় ছিলো?
আমি বললাম, না পড়িনি তো। বিষয়টা কী?
তিনি জানালেন, রোমেলা একটি ছোট্ট মেয়ে। গৃহপরিচারিকা হিসাবে কাজ করতো এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায়। সেখানে কীভাবে সে নির্যাতিত হয়েছে, তা নিয়েই খবর। সংক্ষেপে তিনি যতটুকু বললেন, শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী ১০ বছরের শিশু রোমেলাকে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করেছে। দিনের পর দিন ক্ষত বিক্ষত করেছে ছোট্ট শিশুর দেহ ও মনকে।
শুনে আমার বিশ্বাস হলো না। এটাও কি সম্ভব? কোনো নারী, কোনো মা, কীভাবে পারবে একটি শিশুকে প্রহার করতে? অনেক সময় এমন হয়, হয়তো রাগের মাথায় হঠাৎ করে মেরে বসলো। হয়তো বড় কোনো ক্ষতির ইচ্ছা ছিলো না, কিন্তু হয়ে গেলো এক্সিডেন্টলি। কিন্তু যা শুনলাম, তা তো এরকম কিছু নয়। বরং রোমেলাকে মারা হয়েছে দিনের পর দিন। লাঠি, ক্ষুন্তি যখন যা হাতের কাছে পেয়েছেন ওই মহিলা, তাই দিয়ে মেরেছেন। একদিন বা দুইদিন আচমকা ঘটে যায় নি। দিনের পর দিন ঠান্ডা মাথায় নিস্পাপ এই মেয়েটির প্রতি এই আচরণ তিনি করেছেন। কোনো মানুষের পক্ষে, কোনো নারীর পক্ষে কীভাবে সম্ভব হলো এই অমানুষিক নিষ্ঠুরতা?
আমি পুরানো পত্রিকা ঘেটে সেই খবরটি বের করলাম। ভেতরের পাতায়। শিরোনাম, ‘পুলিশের ঘরে নির্যাতন।’ এই শিরোনামটিও আমাকে আহত করলো। কেনো, পুলিশের ঘর না হয়ে যদি এটা অন্য কারো ঘরে হতো তাহলে কি তেমন কিছু অপরাধ হতো না? রিপোর্টটি ডিটেইল পড়লাম। ওই মহিলা নাকি বেলুন, খুন্তি, চামচসহ হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়ে মেয়েটিকে পেটাতেন। একবার খুন্তির আঘাতে তার মাথা কেটে গিয়েছিলো। রক্তে কাপড় ভিজে যায়। রক্ত শুকানোর পর গৃহকর্তী তাকে আবার পেটান। আবার একদিন তাকে খুন্তি গরম করে তার হাতে ছ্যাকা দেয়া হয়। এরকম একবার নাকি মারের চোটে রোমেলার ঠোঁট কেটে গিয়েছিলো, ওই গৃহকর্তী তখন কাপড় সেলাইয়ের সুই সুতা দিয়ে সেই কাটা ঠোট সেলাই করে দিয়েছে! আমার গা শিউরে উঠলো। এও কি সম্ভব? ওই মহিলার কাছে নিশ্চয়ই এনেসথেসিয়ার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ছিলো না। তারও চেয়ে বড় কথা সেই আন্তরিক মানসিকতাও নিশ্চয়ই তার ছিলো না। তাহলে সেলাইয়ের সেই সূচের প্রতিটি আঘাত সহ্য করতে হয়েছে নিস্পাপ সেই শিশুটিকে!
টানা একবার পড়ার পর মনে হলো হয়তো কিছু মিস করতে পারি। দ্বিতীয়বার পড়তে শুরু করলাম, কিন্তু পারলাম না। কয়েক লাইন পড়ার পরই, চোখ ভিজে এলো, সবকিছু কেমন ঝাপসা দেখতে লাগলাম।
এবার আমি রোমেলার পরিবর্তে ওই দম্পতির কথা ভাবতে বসলাম।
ভদ্রলোক পুলিশের এসআই, নাম শাহেদ আলী। আর তার স্ত্রী’র নাম সুইটি বেগম। আমার জানার খুবই ইচ্ছা করলো, ওই পাষন্ড দম্পতির কোনো ছেলে মেয়ে আছে কিনা? যে হাত দিয়ে, হৃদয় দিয়ে তারা রোমেলাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে, সেই হাত আর হৃদয় নিজ সন্তানদের কীভাবে আদর করেন তারা? একাধিক পত্রিকা ঘেটেও জানতে পারলাম না, আদৌ তাদের কোনো ছেলে মেয়ে আছে কিনা?
এরপর থেকে কয়েকদিন পত্রিকায় রোমেলার কী হলো জানতে চেষ্টা করলাম। প্রতিদিনই পেলাম কিছু না কিছু নতুন তথ্য। ১৫.১১.১১ তারিখের পত্রিকায় দেখলাম, রোমেলা পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। তার চিকিৎসা চলছে। পুলিশ সেখানেই তার জবানবন্দি নিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রোমেলা নাকি বলেছে যে এসআই শাহেদ আলী নয়, তার স্ত্রী সুইটি বেগমই নাকি তাকে নির্যাতন করেছে। এমনকি শাহেদ আলী এ বিষয়ে বাধা দিতে গেলে সুইটি বেগম নাকি তাকেও পেটানোর হুমকি দিয়েছেন।
শেষের এই তথ্যটি আমাকে অবাক করলো। আসলেই কি এমন ঘটনা ঘটেছে? আসলেই কি পুলিশকে এমন কথা বলেছে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা রোমেলা? নাকি এটা সহকর্মীকে বাঁচাতে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার বানানো তথ্য? কারো জবানবন্দি’র উপর ভিত্তি করে পুলিশ কর্মকর্তারা যখন রিপোর্ট লেখেন, তাতে প্রকৃত ওই জবানবন্দি হুবহু কতটুকু থাকে, সে বিষয়ে আমার সামান্য হলেও অভিজ্ঞতা আছে। আমি জানি, এই দেশে কত দ্রুত এক হাত থেকে আর এক হাতে পৌঁছতে পৌঁছতেই পাল্টে যায় তথ্যগুলো।
তারপরেও না হয় ধরে নিলাম, রোমেলাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন শাহেদ আলী। কিন্তু স্ত্রী’র কাছ থেকে পিটুনির ভয়ে কিছু করতে পারেন নি! শাহেদ আলী একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার দায়িত্বই হচ্ছে দুষ্ট লোকের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো পুলিশ যদি দেখে, দু’জন দুষ্ট লোক একজন নিরীহ মানুষকে মারধোর করছে, তখন তার দায়িত্ব কী হবে? বাধা দিতে গেলে তাকেও মার খেতে হতে পারে, এই ভয়ে সে কি দূরে দাড়িয়ে থাকবে? তাহলে রাষ্ট্র তাকে অস্ত্র ব্যবহারের যে ক্ষমতাটি দিয়েছে, সেটা কেনো?
যে পুলিশ কর্মকর্তা নিজের স্ত্রী’র নিষ্ঠুর নির্যাতনের হাত থেকে নিস্পাপ একটি শিশুকে রক্ষা করতে পারে না, তার পুলিশ বিভাগে কাজ করার আদৌ যোগ্যতা আছে কিনা, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।
এখন মনে হয়, আসলে শাহেদ আলীদের সংখ্যাই বোধ করি পুলিশ বিভাগে বেশি। আর সেই জন্যেই দিনে দুপুরে, প্রকাশ্যে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই, রাহাজানিসহ নানা দুষ্কর্ম হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়।
বিদিশা : ফ্যাশন ডিজাইনার ও লেখক।